শিশুর বডি মাসাজের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং কিভাবে করবেন- তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিপসঃ

শিশুর বডি মাসাজের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং কিভাবে করবেন- তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিপসঃ

শরীর মাসাজ শিশুর নিয়মিত পরিচর্যার অংশ। স্বাস্থ্যকর মাসাজ  শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর নিয়মিত মাসাজ করলে শিশু হবে প্র্রাণবন্ত। একটি পরিপূর্ণ ম্যাসাজ দিতে পারে, শিশুর পূর্ণ তৃপ্তিময় ঘুম। শিশুর বডি মাসাজের মাধ্যমে অনেক গুলো সম্যাসার সমাধান করে, যেমন অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি রোধ করে, শিশুর বদ হজম কমিয়ে ক্ষুধা বৃদ্ধি করে, শরীরে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে এবং সংকুচিত টিস্যু গুলো স্বাভাবিক হয়।

কিন্তু, কখনো জানা হয় না কীভাবে সঠিক উপায়ে তেল মাসাজ  করতে হয় এবং এর উপকারিতা। শিশুর বডি মাসাজ  করার জন্য বেবি মাসাজিং জেল, বেবি অয়েল বা বেবি লোশন ব্যবহার করতে পারেন। সহজ কথায়, শিশুর শরীর পিচ্ছিল করতে হবে যাতে ম্যাসাজ করতে সুবিধা হয়। আট সপ্তাহ বয়সের পর হতে মাসাজ করা ভাল।

মাসাজ এর উপকারিতা

মাসাজ এর ফলে বাচ্চা বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়। মাসাজের ফলে বাচ্চার যেসব উপকার হতে পারে সেগুলো হলো

  • শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ঠান্ডা ,জ্বর ও পেটের অসুখের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
  • শিশুর মস্তিস্ক গঠনে সহায়তা করে।
  • শিশুর জড়তা কাটিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে সাহায্য করে এবং শিশুর হাড় মজবুত করে।
  • বাচ্চার মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।
  • বাচ্চা শান্ত থাকে এবং খুব সহজে বিরক্ত হয়না।
  • কান্নাকাটি কম করে।
  • ঘুম ভালো হয়। 
  • শিশুর বৃদ্ধি সহায়ক হরমোনকে উদ্দীপিত করে।
  • দেহের ব্যথা ও ক্লান্তি দূর হয়।

শিশুর মাসাজের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় খেয়াল করতে হবে

১।  স্থান ২।  সময় ৩। পদ্ধতি।

মাসাজের স্থানঃ শিশুর বডি মাসাজের ক্ষেত্রে ঘর হতে হবে আরামদায়ক ও পরিষ্কার। লক্ষ্য রাখতে হবে ঘরটি যেন উষ্ণ, বদ্ধ ও স্যাঁতসেঁতে না হয়।

মাসাজের সময়ঃ শিশুকে খালি পেটে কিংবা ভরা পেটে বডি মাসাজ করা উচিত নয়। গোসলের আধা ঘণ্টা আগে আর খাওয়ার আধা ঘণ্টা পর মাসাজ করা ভালো।   

মাসাজের পদ্ধতিঃ মাসাজের পদ্ধতি জানার আগে জানা প্রয়োজন মাসাজের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে।

ম্যাসাজ শুরু করার আগে যা যা প্রয়োজন:

আপনি চাইলে কুসুম গরম তেল ব্যবহার করতে পারেন। তার জন্য গরম পানির উপরে তেলের বাটি রেখে দিন এমনিতেই গরম হয়ে যাবে। সেটা শিশুর জন্য বেশি উপভোগ্য হবে। ম্যাসাজ শুরু করার আগে যা যা প্রয়োজন তা হল-

  • একটি চাদর বা তোয়ালে ( বিছানোর জন্য )
  • তেল, ক্রিম বা লোশন ( ম্যাসাজের জন্য )
  • বাটি (তেল রাখার জন্য )
  • নরম তোয়ালে (শরীর মোছার জন্য )
  • গরম পানি (তেল গরম করার জন্য এবং গোসলের জন্য )
  • পর্যাপ্ত সময়।

কিভাবে মাসাজ করবেন?

ছয়টি ধাপে শিশুকে ভালোভাবে মাসাজ করান যায়। এগুলো হলো-

  • প্রথম ধাপঃ  প্রথমে শিশুর পা থেকে মাসাজ শুরু করতে হবে। দুই হাত দিয়ে আলতো করে শিশুর দুই পায়ের পাতা থেকে হাটু পর্যন্ত মাসাজ করতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে হাটুর উপরে, উরুর অংশে মাসাজ  করতে হবে। দুই হাত দিয়ে আলতো করে চাপ দিলে শিশু আরাম পাবে। পায়ের আঙ্গুলগুলো আলতো করে মাসাজ করতে হবে।
  • দ্বিতীয় ধাপঃ পায়ের দিক থেকে পেটের নিচের অংশে মাসাজ  করতে হবে। ঘড়ির কাঁটার মতো করে পেটের উপর ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে মাসাজ  করতে হবে।
  • তৃতীয় ধাপঃ পেটের পর বুকের দিকে মাসাজ  শুরু করতে হবে। আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে চাপ দিয়ে শিশুর কাধ পর্যন্ত মাসাজ  করতে হবে।
  • চতুর্থ ধাপঃ শিশুর দুই হাত হালকা টেনে টেনে মাসাজ  করতে হবে। শিশুর হাত দুদিকে ছড়িয়ে নিয়ে মাসাজ  করাতে হবে।
  • পঞ্চম ধাপঃ শিশুর মুখমন্ডল ধীরে ধীরে মাসাজ  করে দিতে হবে। শিশুর মুখের চারপাশে ছোট ছোট চাপ দিয়ে শিশুকে আরাম দিতে হবে।
  • ষষ্ঠ ধাপঃ সবশেষে শিশুর পেছন দিকে ভালোভাবে মালিশ করে দিতে হবে। মেরুদন্ডের দিক সোজা রেখে ঘাড় পর্যন্ত মালিশ করতে হবে যাতে শিশুর মেরুদণ্ড সোজা ও শক্ত হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়

  • প্রথমেই নিজের হাতটি ভাল করে ধুয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন আপনার হাতে থাকা জীবাণু কোনও ভাবেই যেন শিশুর ত্বকের সংস্পর্শে না আসে। বেবি অয়েল আগে নিজের হাতে নিয়ে একটু ঘষে নিন। আপনার শরীরের তাপমাত্রার সঙ্গে তেলের তাপমাত্রা মেলানো জরুরি।
  • বাচ্চার শরীর মাসাজ তার পা থেকে শুরু করুন যাতে সে মানিয়ে নেয়ার সময় পায়। পায়ে স্পর্শ বাচ্চার জন্য স্বস্তিদায়ক কারণ তার ডায়াপার পরিবর্তনের সময় পায়ে স্পর্শ পেতে সে অভ্যস্ত। মাসাজের সময় নিয়ম মেনে করার চেষ্টা করুন, যেমন প্রথমে পা, তারপর পেট, বুক হাত এভাবে। এতে বাচ্চা বুঝতে পারবে কোনটার পর কোনটা আসবে এবং সে এতে আরামবোধ করবে।
  • বাচ্চার প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করুন। বাচ্চা নিজেই আপনাকে বুঝিয়ে দিবে কখন মাসাজ বন্ধ করতে হবে। বাচ্চা যদি মাসাজের সময় কান্না শুরু করে তবে মাসাজ বন্ধ করে দিন।
  • শিশুদের সম্পুর্ন দেহই খুব বেশি নমনীয়। আর তাই যে কোন কাজই করতে হবে সতর্কতার সাথে। অধিকাংশ মায়েরা যে সাধারণ ভুল করে থাকেন তা হচ্ছে হাতের তালু দিয়ে মালিশ করা। আপনার হাতের তালুর ঘর্ষণ সহ্য করার ক্ষমতা আপনার ছোট্ট শিশুর নেই। হাতের তালুর বদলে আপনার আঙুলের অগ্রভাগের নমনীয় অংশ ব্যাবহার করুন। মনে রাখবেন শিশুর দেহে যত আলতো ভাবে মালিশ করতে পারবেন ততই তার জন্য ভালো। তাই তাড়াহুড়া করা বা জোরে মালিশ করা থেকে সম্পুর্ন বিরত থাকুন।
  • মাসাজ করার সময় শিশুর শান্ত থাকা খুবই জরুরী। এসময় শিশু মাসাজ উপভোগ করতে পারবে। মাসাজের সময় শিশুর সাথে বেশি বেশি কথা বলতে হবে বা গান শোনাতে পারেন।
  • শিশুর মাসাজের তেল অলিভ অয়েল হলে ভালো হয়। কিন্তু সরিষার তেল ও বাদামের তেল শিশুর জন্য ক্ষতিকর। বাজারে অনেক ধরনের বেবি অয়েল রয়েছে, এগুলো ব্যাবহার করার আগে সচেতন থাকতে হবে। গুণগত মান নিশ্চিত হয়ে ব্যাবহার করতে হবে।
  • মাসাজের মাধ্যমে মা-বাবার সাথে শিশুর সুদৃঢ় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। যেসব মায়েরা প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগেন, তাদের জন্য বাচ্চার মাসাজ করানো উপকারি। তাছাড়া বাবারাও শিশুকে মাসাজ করানোর মাধ্যমে অফিসের কাজের স্ট্রেস কাটিয়ে উঠতে পারে।

বিঃ দ্রঃ উপযুক্ত প্রি-ম্যাচিউর ও কলিক বাচ্চাদের জন্য ও মাসাজ অনেক উপকারি।

বিঃদ্রঃ  নবজাতক শিশুকে মালিশ করালে, শিশুর ভালো হবেই না বরং খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  তবে চিকিৎসকদের মতে, প্রথম একমাস শিশুকে তেল, সাবান, পাউডার, ক্রিম, কাজল ইত্যাদি ব্যবহার করা উচিত নয়। ২ মাস পর থেকে অলিভ অয়েল দেওয়া যেতে পারে, তবে সরিষার তেল,বাদামের তেল শিশুকে দেওয়া যাবে না।

Leave a Reply

×

Cart